৯ম পে স্কেলে কে কত টাকা বেতন পাবেন? সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬। নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে—কোন গ্রেডে কত টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা কত টাকা পাবেন এবং ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কত হবে?
এই প্রতিবেদনে নবম পে স্কেলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরা হলো।
৯ম পে স্কেল ২০২৬ অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশ
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ বেতন-সংক্রান্ত আদেশ জারি করে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশিত হয়।
নতুন কাঠামোতে আগের মতোই মোট ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী:
- সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০,০০০ টাকা।
- সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১,৫৬,০০০ টাকা।
- ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৪৪,০০০ টাকা।
- সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ।
- সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে।
৯ম পে স্কেলে কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন?
নতুন পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। চাকরির পদ, নিয়োগের যোগ্যতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন গ্রেডে বেতন পান।
নতুন কাঠামোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বেতনের তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
| গ্রেড | নতুন মূল বেতনের তথ্য |
|---|---|
| ১ম গ্রেড | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ৯ম গ্রেড | ৪৪,০০০ টাকা |
| ২০তম গ্রেড | ২০,০০০ টাকা |
এগুলো মূল বেতনের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারিত অঙ্ক। অন্যান্য গ্রেডের সম্পূর্ণ বেতনধাপ, ইনক্রিমেন্ট ও বেতন নির্ধারণের জন্য সরকারি গেজেটের সংযুক্ত বেতন সারণি দেখতে হবে।
২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা কত টাকা বেতন পাবেন?
সরকারি চাকরিতে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেলে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা। নতুন কাঠামোতে তা বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের একজন নতুন কর্মচারীর প্রারম্ভিক মূল বেতন আগের তুলনায় ১১,৭৫০ টাকা বেশি হবে। তবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা যোগ হলে মোট বেতন আরও বেশি হবে।
৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা কত টাকা বেতন পাবেন?
বাংলাদেশে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অনেক প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা ৯ম গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করেন।
নতুন পে স্কেল অনুযায়ী ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৪৪,০০০ টাকা। আগের কাঠামোতে এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ২২,০০০ টাকা।
অর্থাৎ ৯ম গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। এর সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা যুক্ত হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কত শতাংশ বাড়ছে?
নতুন পে স্কেলে গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির হার এক রকম নয়। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিশেষভাবে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।
এর ফলে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোতে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন।
বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কত পাওয়া যাবে?
শুধু মূল বেতন নয়, সরকারি চাকরিজীবীদের মোট মাসিক বেতনের একটি বড় অংশ আসে বিভিন্ন ভাতা থেকে। নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাড়িভাড়া ভাতার হার কর্মস্থলের অবস্থান এবং গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং অন্যান্য এলাকার জন্য আলাদা হার রয়েছে।
এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধা সরকারি আদেশ অনুযায়ী দেওয়া হবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে এমন যোগ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
৯ম পে স্কেল কবে থেকে কার্যকর?
নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সব বেতন একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী বাস্তবায়নের সময়সূচি হলো:
১. ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬: ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে।
২. ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৭: ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে।
৩. ১ জুলাই ২০২৭ থেকে: সব গ্রেডে নতুন মূল বেতনের ১০০ শতাংশ কার্যকর হবে।
৪. ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে: নতুন পে স্কেল অনুযায়ী সংশোধিত ভাতাগুলো কার্যকর হবে।
অর্থাৎ নতুন মূল বেতনের সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভাতার সংশোধিত হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।
পেনশনভোগীরা কী সুবিধা পাবেন?
নতুন বেতন কাঠামোতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। যাঁরা বর্তমানে কম পেনশন পান, তাঁদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক নিট পেনশন ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত হলে ১০০ শতাংশ, ৯,০০১ থেকে ২০,০০০ টাকা হলে ৭৫ শতাংশ এবং ২০,০০১ থেকে ৩০,০০০ টাকা হলে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য পেনশন স্তরের জন্যও আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
শেষ কথা
নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫৬,০০০ টাকা করা হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, মূল বেতন এবং হাতে পাওয়া মোট বেতন এক বিষয় নয়। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, অন্যান্য সুবিধা, কর্তন এবং চাকরির ইনক্রিমেন্টের ওপর নির্ভর করে একজন কর্মচারীর প্রকৃত মাসিক বেতন নির্ধারিত হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের উচিত নিজেদের গ্রেড অনুযায়ী সঠিক বেতন জানতে অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ৯ম জাতীয় বেতন স্কেলের সরকারি গেজেট অনুসরণ করা।






Leave a Reply