আমাদের মধ্যে অনেকেরই ইচ্ছা বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর। নতুন নতুন কিছু দেখা।
পৃথিবীকে আরো গভীরভাবে জানা। অনেকে আগ্রহ জাগে পুরনো ইতিহাস সম্পর্কে। এই
জনপ্রিয় স্থানগুলোর কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। কেনই বা এটা এত জনপ্রিয় হয়ে
উঠেছে।
তেমনই দুইটা স্থান হলো চীনের মহাপ্রাচীর ও তাজমহল।এগুলো তৈরির পিছনে রয়েছে অনেক
ইতিহাস অনেক মানুষের পরিশ্রমের কথা। রয়েছে অনেক কাহিনী। সেসঙ্গে এগুলো সেরা
পর্যটক হিসেবেও কিন্তু অনেক পরিচিত।
চীনের মহাপ্রাচীর
মানব প্রকৌশলের এক অন্যতম নিদর্শন হলো চীনের মহাপ্রাচীর। এটি পৃথিবীর
দীর্ঘতম প্রাচীর হিসেবে পরিচিত। এই দীর্ঘতম প্রাচীর মানুষের তৈরি এই
পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। চীনের মহাপ্রাচীর বলতে কোন একক প্রাচীর কে বোঝানো হয়
না। চীনের ছোট বড় প্রায় সবগুলো প্রাচীর মিলে একসাথে বলা হয়,
দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না। উত্তর চীনের প্রায় 15 টি অঞ্চল মিলে এই
মহাপ্রাচীর নির্মিত হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায় এটি কত দীর্ঘ একটি
মহাপ্রাচীর।
মহাপ্রাচীরের সবচেয়ে প্রাচীর অংশ প্রায় ২৭০০ বছর পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব ৭৭০ থেকে
২৬৬ সালে প্রথম এসব ছোট ছোট প্রাচীন নির্মাণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ এ
প্রাচীর নির্মাণ কাজ চলে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত কিন রাজ বংশের আলোকে। এত বড়
স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল এক গুজবের উপর ভিত্তি করে। কিন শি হুয়ান খ্রিস্টপূর্ব
২২১ সালে কিন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন । তার সাম্রাজ্য পাওয়ার আগে, অন্যান্য রাজবংশ
রাজ শত্রুদের ঠেকাতে অনেক ছোট বড় প্রাচীর তৈরি করেছিলেন।
এই প্রাচীর গুলো বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হয়।এটি যেমন একটি মহাপ্রাচী
হিসেবে পরিচিত। তেমনি এটি কিন্তু মহা সমাধি হিসেবেও পরিচিত। কারণ এ প্রাচীরটি
মানুষের তৈরি। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করেছে। কাজ করতে করতে অনেকেরই মৃত্যু
হয়েছে। তাদের সেখানেই সমাধি দেওয়া হয়েছে। আর এই কারনে মূলত এটিকে মহাসমাধি বলা
হয়।
চীনের মহাপ্রাচীর তৈরি শুরু দিকঃ
এর প্রাচীর গুলো তৈরি করা হয়েছে মূলত শত্রুদের ঠেকানোর জন্য। যখন কিন তার
সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তখন তার সাথে এক জাদুকরে দেখা হয়েছিল। সে জাদু
করার তাকে বলে এক সময় শত্রুপক্ষ তাকে পরাজিত করে এর সম্রাজ্য দখল করবেন। তিনি
সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে সেই ছোট বড় প্রাচীর গুলোকে একসাথে জোড়া দিতে থাকে। আর এ
থেকে গড়ে ওঠে চীনের মহাপ্রাচীর। এ কারণেই চীনের মহাপ্রাচি্রটি অনেক দীর্ঘ।
এই প্রাচীর বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রাচীরের দেওয়াল গুলো ছিল অনেক
মজবুত। এই দেওয়াল গুলো এমন ভাবেই তৈরি করা হয়েছে শত্রুরা জেনো খুব সহজে এই
প্রাচীর কে প্রতিহত না করতে পারে। এছাড়াও শত্রুদের প্রতিহত করার জন্য এর
ভেতরেও অনেক বিশেষ নির্মাণ করা হয়েছে।
যেমনঃছোট বড় দুর্গ, পর্যবেক্ষণ চৌকি ছাড়াও আরো অনেক কিছু। পর্যবেক্ষণ চৌকিতে
থেকে শত্রুদের উপর নজর রাখা হতো। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রাখা ছিল। যেন কোন
শত্রু আসলে খুব সহজে থাকে প্রতিহত করা যায়। আলাদা করে কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন
যেন না হয়।
উদ্দেশ্য সফল না হওয়াঃ
এ প্রাচীর চীনের ২০ টি রাজবংশ মিলে তৈরি করেছে। বর্তমানে এর যে নিদর্শন
গুলো দেখা যায় সেইগুলো মিন রাজবংশের তৈরি নিদর্শন। কারণ এগুলো এখন ঠিকই
রয়েছে। এ প্রাচীর তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুদের প্রতিহত করার। এ উদ্দেশ্য
পুরনো হয়েছিল কারণ ছোট বড় অনেক শত্রুদেরই এই প্রাচীর দ্বারা প্রতিহত করা গেছিল।
কিন্তু এই উদ্দেশ্য বেশিদিন সফল হয়নি। চেঙ্গিস খান ও তার মঙ্গল বাহিনী এই
প্রাচীর পার করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তারাই এই সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন।
সেরা পর্যটক স্থান হিসেবে পরিচিত
চীনের মহাপ্রাচীর পাহাড়ের উঁচু স্থানে তৈরি করা হয়েছে। এটি দেখতে যেমন সুন্দর।
এর পুরনো নিদর্শন যেমন সবাইকে মুগ্ধ করে। তেমনই এর চারি পাশে সৌন্দর্য মানুষদের
মুগ্ধ করে। সবুজে ঘেরা বনের মাঝে এই মহাপ্রাচীর অবস্থিত। এটি চীনের সেরা স্থানের
মধ্যে অন্যতম একটি।
এই প্রাচীর তৈরি করার মূল কারণ হলো বিদেশীরা যেন এই সাম্রাজ্যে না আসতে পারে।
কিন্তু অবাক করা কথা হল, এই চীনের মহাপ্রাচীরে বিশ্বের বিভিন্ন বিদেশিদের এখানে
সেখানে টেনে নিয়ে যায়। প্রতি বছর প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই চীনের মহাপ্রাচীর
দর্শন করতে চাই। মহাপ্রাচীরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হল বাড়ালিং। অন্যান্য
স্থানের থেকে এখানে লোকজনের ভিড় বেশি হয়। এ কারণে মূলত সেই জায়গাটিকে অন্যান্য
জায়গার থেকে বেশি সংরক্ষিত করা হয়।
বর্তমানে এর প্রায় অনেক জায়গায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। কিছু প্রাকৃতিক কারণে
এবং কিছু মানুষের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় এই চীনের মহাপ্রাচ্যে। একটা সময় এই
মহাপ্রাচীর পাথরগুলো দিয়ে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ওরাস্তাঘাট তৈরি করা হয়েছে ।
আবার অনেকে এই পাথরগুলো চুরি করে বিক্রিও করেছেন।
তাজমহল
তাজমহল পৃথিবীর অন্যতম নিদর্শন। যা পৃথিবীর দ্বিতীয় স্থানে দেখা যাবে না। তাজমহল
ভারতের উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত। তাজমহল তৈরি করেছিলেন শাহজাহান। তিনি
একজন মুঘল সম্রাট ছিলেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী মমতাজ
মহলের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এই তাজমহলটি তৈরি করেছিলেন।
তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে। এটি তৈরি করতে
প্রয়োজন হয়েছিল ২২ হাজার শ্রমিকের। আর এটি করতে প্রায় ২২ বছর লেগেছিল।
কেন তাজমহল তৈরি করা হয়েছিল
শাহজাহান তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু করল এটি শেষ করতে পারেননি। কারণ তার
ছেলে তাকে বন্দী করে রেখেছিল। যখন তিনি মারা যান, তখন তার দ্বিতীয়
স্ত্রী মমতাজ মহলের পাশে তাকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল । এই তাজমহলটি তৈরি
করতে অনেক বিশেষ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তাজমহল তৈরি করার
আগে আশেপাশে যত দুর্গ বা মহল তৈরি করা হয়েছিল সেগুলো সব লাল পাথর
দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। শাহজাহান প্রথম সাদা শ্বেত পাথর দিয়ে এই তাজমহল
তৈরি করেছিল। এর আগে শ্বেত পাথর দিয়ে কোন মহল তৈরি করা হয়নি।
এখানে শুধু শ্বেত পাথর নয়এছাড়া আরোও বিশেষ পাথরের ব্যবহার করা হয়েছিল।
যেগুলো পৃথিবীর এক এক প্রান্ত থেকে আনা হয়েছিল। এমনকি নির্মাণ কাজ করার
জন্য ১০০০ হাতিও ব্যবহার করা হয়েছিল। এ হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল
মূলত নির্মাণকালে সামগ্রী বয়ে নিয়ে আনার জন্য। এর আসল নকশা কার
ছিল ওস্তাদ আহমেদ লাহোরে।
তাজমহলের সৌন্দর্য
এই তাজমহলের সৌন্দর্যে সকলেই মুগ্ধ হয়। একেক সময় এর একেক রূপ দেখা যায়।
অনেকে বলেন, সকালে তাজমহল দেখতে অনেকটা গোলাপি রঙের মনে হয়, দুপুরে হালকা
হলুদ বর্ণ ধারণ কর্ বিকালে দুধের মত সাদা বর্ণ ধারণ করে আর সর্বশেষে
সন্ধ্যায় লাল সূর্য ও চাঁদের আলোয় সোনালি বর্ণ ধারণ করে। এ দৃশ্যগুলো
দেখতে আসলে অনেক সুন্দর।
তাজমহল কে এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, অনেক বড় ভূমিকম্পেও এটি যেন
সহজে ভেঙে না যায়। এর প্রতিটি কোন অনেক সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভূমিকম্পের
সময় তাজমহলের মিনার গুলো যারা ভেঙে না পড়ে সেই জন্য এগুলোকে অনেক বিশেষ
ভাবে তৈরি করা হয়েছে।তাজমহলে কোন লোহার কাঠামো ব্যবহার করা হয়নি।
পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে এই তাজমহল নির্মিত হয়েছে। তাজমহলের সবচেয়ে
বিস্ময়কর কারুকার্য হলো তাজমহলের সবচেয়ে বড় গম্বুজ। কারণ এই
গম্বুজে অনেক বিশেষ ধরনের কারুকার্য করা হয়েছে। এই গম্বুজ নির্মাণেও কোন
লোহার কাঠামো ব্যবহার করা হয়নি। তাজমহলের চারপাশে চারটি মিনার
রয়েছে। এটি তাজমহলের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে।
মিনার গুলো তিন ভাগে বিভক্ত। এছাড়াও এর চারপাশে সৌন্দর্য তাজমহলকে আরো
বিস্ময়কর করে তোলে।তাজমহল সম্পর্কে অনেকে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন
তাজমহল তৈরি করার পর শ্রমিকদের হাত শাহজাহান কেটে দিয়েছিল। যেন
পরবর্তীতে এরকম মহল আর কেউ বানাতে না পারে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন
একটি গল্প। কারণ শাহজাহান তাজমহলের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে মারা
গিয়েছিলেন।
শেষ কথা
প্রিয় পাঠক আশা করছি আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনি সিনিয়র মহাপ্রাচীর ও
তাজমহল সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পেরেছেন। আজকের এই আর্টিকেল যদি আপনার কোন
উপকারে লাগে তাহলে অবশ্যই আপনি কমেন্ট করে জানাবেন।







Leave a Reply